জিনের কাঁচি: সম্ভাবনার আলো ও নৈতিকতার অন্ধকার প্রসঙ্গে চীনের ফ্রাঙ্কেনস্টাইন- সাদিয়া ইয়াসমিন 

·

By

·

4–6 minutes

to read

মেরি শেলির উপন্যাসের বিখ্যাত চরিত্র ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের কথা কমবেশি আমরা সবাই জানি। যে কিনা খুব মেধাবী ও কৌতুহলী ছিলেন। আর গবেষণাগারে মৃতদেহের বিভিন্ন অংশ জোড়াতালি দিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন এক প্রাণীকে; প্রাণী নয় বরং দানব। 

২০১৮ সালের এক আবিষ্কার বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে দিয়েছিলো। কারণ ছিলো হি জিয়ানকুই (He Jiankui) নামক একজন চীনা বিজ্ঞানী। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতোই তিনি সেদিন ঘোষণা দিয়েছিলেন এক অভাবনীয় আবিষ্কারের, ‘পৃথিবীর প্রথম জিন সম্পাদিত শিশুর জন্মে তিনি অবদান রেখেছেন।’ মুহূর্তের মধ্যেই সারাবিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। কেউ তার আবিষ্কারকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও, আবার কেউ কেউ দেখছিলেন মানবজাতির জন্য বিপজ্জনক এক ভবিষ্যৎ হিসেবে। কিন্তু কি ছিলো তার আবিষ্কার? কিংবা তার অপরাধ? 

২০১৮ সালে University of Hong Kong এ অনুষ্ঠিত International Human Genome Editing Summit এ তার যুগান্তকারী আবিষ্কার সম্পর্কে বক্তৃতা প্রদানকালে He Jiankui (Source: NY Times) 

মূলত CRISPR – Cas9 নামক ইডিটিং কৌশল ব্যবহার করে তিনি Lulu ও Nana নামে দুইজন জমজ শিশুর  DNA এর জিনের CCR5 অংশ পরিবর্তন করেছিলেন, যা তাদেরকে HIV সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী করে তোলে। কারণ, তাদের বাবা ছিল এইচআইভি পজিটিভ [১]। 

তখন প্রশ্ন উঠেছিলো, মানুষ কি সত্যিই জীবনের নকশা পরিবর্তনের অধিকার রাখে? রোগমুক্ত ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন কি আমাদেরকে এমন এক পৃথিবীর দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে শিশুর বুদ্ধিমত্তা, সৌন্দর্য থেকে শুরু করে অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্যও আগে থেকেই নির্ধারণ করা যাবে?

কিন্তু সব কল্পনা জল্পনার দরজায় শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিলেন চীনা সরকার, তার এই আবিষ্কারের জন্য তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় [১]।  কারণ হিসেবে দেখানো হয়, ভ্রুণ পর্যায়ে জিন ইডিটিং এর ফলে বাচ্চাদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এবং অনেক বিজ্ঞানী মনে করেছিলেন, তিনি বৈজ্ঞানিক নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করেছেন।

লুলু এবং নানা’র বর্তমান সময়ের ছবি (Source: UpsoMedia) 

বিজ্ঞান যত এগিয়েছে, মানুষ তত বেশি প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু CRISPR প্রযুক্তি যেন সেই চেষ্টাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। এটি শুধু রোগ নিরাময়ের সম্ভাবনা তৈরি করেনি, বরং মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ, নৈতিকতা এবং সামাজিক সমতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

CRISPR কি? 

            Clustered Regularly Interspaced Short Palindromic Repeats (CRISPR) হলো একটি আধুনিক জিন-সম্পাদনা (gene editing) প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে জীবের DNA-র নির্দিষ্ট অংশ পরিবর্তন, কাটা বা সংশোধন করা যায়। যা মূলত ব্যাকটেরিয়ার একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে আবিষ্কৃত হয়েছিল [২]। 

CRISPR কীভাবে কাজ করে?

            CRISPR সাধারণত Cas9 নামক ‘enzyme’ ব্যবহার করে কাজ করে। এটি DNA-র নির্দিষ্ট জায়গা খুঁজে কেটে আণবিক কাঁচি হিসেবে ভূমিকা পালন করে [৩]। 

CRISPR কি এবং কিভাবে কাজ করে বিস্তারিত (Source: CBInsight) 

CRISPR-Cas9 এর সম্ভাবনা 

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন গুটিকয়েক প্রযুক্তি বা আবিষ্কার রয়েছে যা মানুষের ভবিষ্যৎকে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। CRISPR-Cas9 জিন ইডিটিং এমনই একটি প্রযুক্তি। একসময় যেসব রোগকে জন্মগত অভিশাপ মনে করা হতো, CRISPR সেগুলোকে চিকিৎসাযোগ্য সমস্যায় পরিণত করার আশা দেখাচ্ছে। এমনই কিছু সাফল্য হলো [৪, ৫] : 

১. থ্যালাসেমিয়া (β-Thalassemia): থ্যালাসেমিয়া রোগীর শরীর পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না। CRISPR-Cas9 ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা রোগীর স্টেম সেল সম্পাদনা করে হিমোগ্লোবিন উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। 

২. সিকেল সেল অ্যানিমিয়া: এ রোগে শরীরের লোহিত রক্তকণিকা অস্বাভাবিক আকৃতি (কাস্তের মতো) ধারণ করে, ফলে রক্তপ্রবাহে সমস্যা দেখা দেয়। CRISPR-Cas9 প্রযুক্তির ব্যবহারে রোগীর স্টেম সেল সম্পাদনা করে fetal hemoglobin বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে, যা ক্ষতিকর sickle hemoglobin এর প্রভাব কমায়।

৩. সিস্টিক ফাইব্রোসিস: এটি এমন একটি জিনগত রোগ, যা ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বর্তমানে গবেষকরা CRISPR-Cas9 প্রযুক্তি ব্যবহার করে CFTR gene এর ত্রুটি সংশোধনের উপায় আবিষ্কারের লক্ষ্যে কাজ করছেন।

৪. ক্যান্সার চিকিৎসায় CRISPR-Cas9: বর্তমানে বিজ্ঞানীরা রোগীর শরীরের রোগ প্রতিরোধক কোষকে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আরও কার্যকর করে তোলার চেষ্টা করছেন, যাতে শরীর নিজেই ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম হয়।  

৫. Personalized Medicine: প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় একই চিকিৎসা পদ্ধতি সবার জন্য প্রয়োগ করা হয়৷ বর্তমানে CRISPR-Cas9 এর কল্যাণে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা Personalised চিকিৎসার দিকে গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। রোগীর DNA বিশ্লেষণ করে তার জন্য সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে চিকিৎসা এখন আরও নির্ভুল ও কার্যকর। 

জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি ও বাংলাদেশের জন্য CRISPR-এর গুরুত্ব

            জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে হুমকিস্বরূপ। বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হওয়ায় এই সংকটের প্রভাব বাংলাদেশে আরও ভয়াবহ। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং খরার কারণে প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণ কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে CRISPR প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এমন ফসল তৈরি করার চেষ্টা করছেন, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম হবে। উদাহরণস্বরূপ, লবণসহিষ্ণু ধান, খরাসহিষ্ণু গম, রোগপ্রতিরোধী সবজি, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বা পানির স্বল্পতা মোকাবিলা করার মতো ফসল ইত্যাদি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা সফলও হয়েছেন।    

CRISPR-Cas9 নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা 

সবচেয়ে বড় বিতর্ক He Jiankui এর ‘ডিজাইনার বেবি’ ধারণাকে ঘিরে। যদি সত্যি সত্যি বিজ্ঞানীরা জন্মের আগেই শিশুর DNA পরিবর্তন করতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে বাবা-মায়েরা নিজেদের পছন্দমতো সন্তানের বৈশিষ্ট্য নির্বাচন করতে চাইবেন না? তাহলে বুদ্ধিমত্তা, উচ্চতা কিংবা শারীরিক গঠন কি একদিন প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে?

এইসব প্রশ্ন এখন শুধু বিজ্ঞানের নয়; এটি সামাজিক সমতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদি জিন সম্পাদনার সুবিধা কেবল ধনী মানুষদের জন্য সহজলভ্য হয়, তাহলে সমাজে ‘জিনগত বৈষম্য’ তৈরি হবে। পৃথিবীতে বিদ্যমান সমাধান বিহীন হাজারো বৈষম্যের মাঝে আরও একটি নতুন বৈষম্য তৈরীর জন্য কি আমরা সমর্থন করব? 

CRISPR-Cas9 এর ঝুঁকি 

আমাদের শরীরের অত্যন্ত জটিল একটি বিষয় হলো DNA। এর একটি ক্ষুদ্র পরিবর্তনও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারেননি যে জিন সম্পাদনার প্রতিটি পরিবর্তন শতভাগ নিরাপদ কি না। ভুল সম্পাদনা অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ভবিষ্যতে নতুন কোনো রোগ বা জটিলতার কারণ হয়ে দাড়াতে পারে [৬]।

বর্তমানে মানুষের পরিচয়, স্বাস্থ্যের অবস্থা থেকে ভবিষ্যৎ সবকিছুই ক্রমশ জেনেটিক তথ্যের সাথে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এমনও হতে পারে, DNA ডেটাবেস চিকিৎসা, চাকরি কিংবা বীমা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাড়াবে। তখন প্রশ্ন উঠতে পারে, একজন মানুষের জিনগত তথ্য কতটা ব্যক্তিগত এবং কতটা নিরাপদ? যদি কারও জেনেটিক দুর্বলতাকে ব্যবহার করে সমস্যা সৃষ্টি হয়, তাহলে কী হবে? প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, গোপনীয়তা ও মানবাধিকারের প্রশ্নও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে [৭]।

সর্বোপরি, প্রযুক্তি নিজে কখনও ভালো বা খারাপ নয়, এটির ব্যবহারের উদ্দেশ্যই নির্ধারণ করে এটি মানবতার জন্য আশীর্বাদ হবে, নাকি বিপদ হয়ে দাড়াবে? CRISPR আমাদের হাতে এমন এক অলৌকিক শক্তি তুলে দিয়েছে, যা আমাদের জীবনের ভাষাকেই পুনর্লিখন করার সুযোগ করে দিয়েছে। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ শক্তিকে ব্যবহার করার আগে প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক সতর্কতা, নৈতিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়।

লিখেছেনঃ নামঃ সাদিয়া ইয়াসমিন, বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড বায়োটেকনোলজি, University of Science and Technology Chittagong (USTC), চকবাজার, চট্টগ্রাম 

Categories:

Leave a Reply

Keep Reading

Discover more from Bhola Science Club

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading