হাইব্রিড ধান: খাদ্য নিরাপত্তার নতুন সমীকরণ

ভোলা বিজ্ঞান ক্লাব ডেস্ক: বাংলাদেশে হাইব্রিড ধানের চাষ এখন আর পরীক্ষামূলক পর্যায়ে নেই; এটি ধীরে ধীরে মূলধারার কৃষিতে জায়গা করে নিচ্ছে। গত চার বছরে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বোরো মৌসুমে প্রায় ১.৪ থেকে ১.৫ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধানের চাষ হচ্ছে,…

ভোলা বিজ্ঞান ক্লাব ডেস্ক:

বাংলাদেশে হাইব্রিড ধানের চাষ এখন আর পরীক্ষামূলক পর্যায়ে নেই; এটি ধীরে ধীরে মূলধারার কৃষিতে জায়গা করে নিচ্ছে। গত চার বছরে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে বোরো মৌসুমে প্রায় ১.৪ থেকে ১.৫ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধানের চাষ হচ্ছে, যেটা মোট বোরো আবাদি জমির প্রায় ২৮-৩০ শতাংশ। অর্থাৎ চার বছর আগে যে হার ছিল প্রায় এক-চতুর্থাংশ, এখন সেটা আরও বেড়েছে এবং ভবিষ্যতে আরো বাড়বে।

বাংলাদেশের ধান উৎপাদনের সবচেয়ে বড় ভরসা এখনো বোরো মৌসুম। দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশই আসে এই মৌসুম থেকে। আর এই বোরো মৌসুম ক্রমেই আরও বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। ফলে কৃষকরা এখন এমন জাতের দিকে ঝুঁকছেন যেগুলো কম সময়ে বেশি ফলন দিতে পারে। এখানেই আসে হাইব্রিড ধানের গুরুত্ব। গড় হিসাবে এখনো হাইব্রিড ধান ইনব্রেড উচ্চ ফলনশীল জাতের চেয়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি ফলন দেয়। কিছু ক্ষেত্রে এই ব্যবধান আরও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে যেখানে সার, পানি এবং ব্যবস্থাপনা ভালো, সেখানে হাইব্রিডের পারফরম্যান্স বেশি চোখে পড়ে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। আমাদের দেশে যেসব ব্রি ধান বা উচ্চ ফলনশীল ধান চাষ হয়, সেগুলো মূলত ইনব্রেড জাত। এগুলো এমনভাবে উদ্ভাবন করা হয় যাতে কৃষক পরবর্তী মৌসুমের জন্য বীজ রেখে দিতে পারেন। অর্থাৎ বীজের উপর কৃষকের একটি স্বাধীনতা থাকে। কিন্তু হাইব্রিডের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে দুইটি ভিন্ন প্যারেন্ট লাইনের প্রথম প্রজন্ম বা F1কে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়। এই প্রথম প্রজন্মেই দেখা যায় “হাইব্রিড ভিগর”, অর্থাৎ বাবা-মায়ের চেয়েও বেশি শক্তিশালী বা বেশি ফলনশীল বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সমস্যা হলো, এই হাইব্রিড বীজ থেকে পরবর্তী প্রজন্মে একই ফলন পাওয়া যায় না। ফলে কৃষককে প্রতি বছর নতুন করে বীজ কিনতে হয়।

এখানেই বীজ কোম্পানির ব্যবসায়িক শক্তি। বাংলাদেশে এখন বাজারে অনুমোদিত হাইব্রিড ধানের সংখ্যা তিনশোর কাছাকাছি। এর মধ্যে বড় অংশই চীন, ভারত ও অন্যান্য দেশের জার্মপ্লাজমভিত্তিক। দেশীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বেশ কিছু হাইব্রিড উদ্ভাবন করেছে, কিন্তু বাজারে এখনো বিদেশি কোম্পানির আধিপত্য স্পষ্ট।

এখানে আরেকটি নতুন বাস্তবতা যোগ হয়েছে, সেটা হলো জলবায়ু পরিবর্তন। আগে আমরা জলবায়ুর কথা বলছিলাম ভবিষ্যতের ঝুঁকি হিসেবে। এখন সেটি বর্তমান বাস্তবতা। অনিয়মিত বৃষ্টি, দীর্ঘ খরা, আকস্মিক বন্যা, তাপপ্রবাহ এবং লবণাক্ততা ধান উৎপাদনের পরিবেশকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু বেশি ফলন হলেই চলবে না; দরকার প্রতিকূলতা সহিষ্ণু জাত। এই জায়গাতেই ইনব্রেড গবেষণার গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।

ব্রি ইতোমধ্যে লবণাক্ততা সহিষ্ণু, খরা সহিষ্ণু, জলমগ্নতা সহিষ্ণু এবং জিঙ্ক সমৃদ্ধ বহু ইনব্রেড ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। নতুন প্রজন্মের জিনোম এডিটিং, মার্কার-সহায়ক নির্বাচন এবং প্রিসিশন ব্রিডিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন এমন ইনব্রেড জাত তৈরির গবেষণা চলছে, যেগুলোর ফলন হাইব্রিডের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া সম্ভব। বিশ্বের বড় ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোও এখন এই দুই পথেই হাঁটছে। একদিকে হাইব্রিড, অন্যদিকে উন্নত ইনব্রেড। চীন এখনো বিশ্বের হাইব্রিড ধানের শীর্ষ শক্তি। বর্তমানে তাদের মোট ধানের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি আসে হাইব্রিড ধান থেকে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, তারাও এখন “সুপার রাইস” নামে উচ্চফলনশীল ইনব্রেড প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ করছে।

বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্নটা শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নয়; বীজের নিরাপত্তাও। যদি আমরা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হাইব্রিড ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি, তাহলে ভবিষ্যতে বীজ সরবরাহে কোনো বৈশ্বিক ধাক্কা আমাদের খাদ্য ব্যবস্থাকে বিপদে ফেলতে পারে। তাই শুধু আমদানি নয়, দেশীয় হাইব্রিড বীজ উৎপাদন, প্যারেন্ট লাইন উন্নয়ন এবং নিজস্ব জার্মপ্লাজম গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, বাংলাদেশের জন্য হাইব্রিড ধান দরকার, কিন্তু সেটাই একমাত্র পথ নয়। আমাদের সমান্তরালভাবে আরও শক্তিশালী ইনব্রেড গবেষণায় বিনিয়োগ করতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে শুধু বেশি ফলন নয়, স্থিতিশীল ফলনই হবে সবচেয়ে বড় সম্পদ। খাদ্য নিরাপত্তার পূর্বশর্ত বীজের নিরাপত্তা। আর বীজের নিরাপত্তা আসে নিজের হাতে প্রযুক্তি রাখার মাধ্যমে। এই বাস্তবতা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞান লেখকের কলাম


  • বিজ্ঞান
    ভূমিকা: বিজ্ঞান আধুনিক সভ্যতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। মানুষের জ্ঞান, গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রকৃতির রহস্য উদঘাটনের নামই বিজ্ঞান। বর্তমান যুগকে বিজ্ঞান যুগ বলা হয়। মানুষের জীবন সুন্দর, সহজ ও উন্নত করতে বিজ্ঞানের অবদান ও পরিসীমা। শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, শিল্প, যোগাযোগ, পরিবহন প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজ্ঞান যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। তাই বিজ্ঞান ছাড়া আধুনিক জীবন কল্পনা করা যায়… Read more: বিজ্ঞান
  • চিকিৎসা ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উদ্ভাবন
    চিকিৎসাবিজ্ঞান মানবসভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। মানুষের জীবনকে সুস্থ, নিরাপদ ও দীর্ঘায়িত করার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের অবদান অপরিসীম। অতীতের তুলনায় বর্তমান সময়ে চিকিৎসা ক্ষেত্রে অসংখ্য যুগান্তকারী উদ্ভাবন হয়েছে, যা মানুষের জীবনযাত্রাকে আমূল পরিবর্তন করেছে। এসব উদ্ভাবনের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI) চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা পরিকল্পনা, অস্ত্রোপচার এবং রোগীর সার্বিক… Read more: চিকিৎসা ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উদ্ভাবন
  • খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষিজমি সংরক্ষণ
    খাদ্যনিরাপত্তা জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম ভিত। বাংলাদেশ সরকারের উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনগণের খাদ্য ও পুষ্টি উন্নয়নের টেকসই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে খাদ্যনিরাপত্তা বিধান উত্পাদনশীল জমির পর্যাপ্ততার ওপর নির্ভর করে। দেশে প্রতিদিন গড়ে ২২০ হেক্টর কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মানুষ। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ক্রমহ্রাসমান জমির দেশে… Read more: খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষিজমি সংরক্ষণ
  • নগরায়ণ ও পরিকল্পিত ছাদকৃষি
    দেশের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ শহরে বসবাস করে এবং শহরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০৫০ সাল নাগাদ নগরে বসবাসকারী জনসংখ্যা শতকরা ৭০ ভাগে উন্নীত হবে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই নগর নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এর অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সবুজ পরিবেশ, যা বিশুদ্ধ বাতাস ও জীববৈচিত্র্য সম্পন্ন… Read more: নগরায়ণ ও পরিকল্পিত ছাদকৃষি
  • প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধের উৎকৃষ্ট উদাহরণ
    সেই তিনজনকে ধন্যবাদ, যাঁদের প্রতিবাদে আজও টিকে আছে কালের সাক্ষী এই গাছ। এই গাছে আমারও ভাগ আছে, আমি আমার গাছ বিক্রি করব না।’স্কুলশিক্ষক আবদুল লতিফ, গ্রামের কৃষক আলী আফজাল খাঁ আর মুরব্বি মফিজ উদ্দিনের এই এক কথায় থেমে গিয়েছিল প্রায় পাঁচশ বছর পুরোনো বটগাছ কাটার তোড়জোড়। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে এত বছরের একটা ঐতিহ্যকে বিক্রি… Read more: প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধের উৎকৃষ্ট উদাহরণ

Leave a Reply

Discover more from Bhola Science Club

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading