প্রাণের স্পন্দন ও মাটির গান: সভ্যতায় জীববিজ্ঞানের নবজাগরণ- দৃষ্টি ঘোষ গল্প

·

By

·

10–14 minutes

to read

ভোরের প্রথম আলো যখন কুয়াশার চাদর ভেদ করে কাঁচা ধানের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু যখন স্পর্শ করে , তখন মাটির বুক থেকে এক অদ্ভুত গন্ধ ভেসে আসে। এই গন্ধের ভেতর লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, আদিম মানুষের বেঁচে থাকার নাড়ির টান এবং এক নিঃশব্দ প্রাণের স্পন্দন। আমরা যান্ত্রিক সব ঘড়ি আর কংক্রিটের ইট-কাঠের খাঁচায় যতই নিজেদের বন্দি করি না কেন, শেকড়ের টানে এই মাটি আর সবুজের কাছেই আমাদের ফিরে আসতে হয়। মানুষের এই আদিম সখ্য আর প্রকৃতির নিয়মের মাঝে সেতুবন্ধন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে বিজ্ঞান, সেটি হল জীববিজ্ঞান। সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকে শুরু করে আজকের এই উচ্চ প্রযুক্তির যুগে এসেও মানুষ ও প্রকৃতির এই নিবিড় মিতালি প্রতিনিয়ত নতুন রূপ ধারণ করছে। জীবনকে তার ক্ষুদ্রতম কণা থেকে শুরু করে সুবিশাল ব্রহ্মাণ্ডের মাপে উপলব্ধি করার যে দীক্ষা এই বিজ্ঞান আমাদের দেয়, তা অন্য কোনো উপায়ে পাওয়া সম্ভব নয়।

জীববিজ্ঞানের পরিধি নিয়ে কথা বলতে গেলে লিখে শেষ করা যাবে না । কোষের অণুবীক্ষণিক জগত থেকে শুরু করে পৃথিবীর জটিলতম বাস্তুতন্ত্র বা “ইকোসিস্টেম”, সবকিছুই এর কেন্দ্রমূলে গাঁথা। মানুষ যখন প্রথম বুঝতে শিখেছিল কীভাবে একটি ছোট্ট বীজ থেকে মহীরুহের জন্ম হয়, ঠিক সেদিন থেকেই উদ্ভিদবিজ্ঞানের যাত্রা শুরু হয়েছিল। আবার বনের পশুপাখির চলাফেরা, তাদের খাদ্যাভ্যাস আর বিবর্তনের ধারা পর্যবেক্ষণ করতে করতে প্রাণীবিজ্ঞানের জন্ম। কিন্তু আজ সেই সাধারণ কৌতূহল আর পর্যবেক্ষণ কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই। ডিএনএর কুণ্ডলী বা জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের মারপ্যাঁচ ভেদ করে বিজ্ঞানীরা আজ মানুষের জন্মগত ত্রুটি সারানোর রাস্তা খুঁজে পেয়েছেন। এই সুবিশাল জগতটা যেন এক জীবন্ত রূপকথা, যেখানে বিজ্ঞানের প্রতিটি পদক্ষেপে জীবনের নতুন কোনো না কোনো রহস্য উন্মোচিত হচ্ছে। মানুষ প্রকৃতির এই অবারিত ক্যানভাসে নিজের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রতিনিয়ত নতুন রঙের প্রলেপ লাগাচ্ছে, যা আমাদের অস্তিত্বের ক্যানভাসকে আরও বেশি অর্থবহ করে তুলছে।

তবে এই রহস্যের আসল রূপটি সবচেয়ে তীব্রভাবে প্রকাশ পায় যখন তা কৃষির সাথে যুক্ত হয়। একটা সময় ছিল যখন মানুষ পুরোপুরি প্রকৃতির করুণার ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকত। আকাশ সময়মতো বৃষ্টি না দিলে কৃষকের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠত, আর সর্বস্ব হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকত না। কিন্তু সময়ের স্রোতে জনসংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, তাতে প্রথাগত কৃষিকাজ আর মানুষের চাহিদা মেটাতে পারছিল না। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে জীববিজ্ঞান এসে কৃষির পুরো চেহারাটা একেবারে পাল্টে দিল। জিন প্রকৌশল বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কল্যাণ ছাড়া মানুষের এই খাদ্যের জোগান টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হতো। আজ ল্যাবরেটরিতে এমন সব ধানের বীজ তৈরি হচ্ছে যা পোকার আক্রমণ বুক চিতিয়ে প্রতিহত করতে পারে। খেতের ফসল রক্ষা করতে এখন আর ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ঢালতে হয় না, বরং পরিবেশবান্ধব বায়োপেস্টিসাইড বা জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করে মাটির উর্বরতা ঠিক রাখা হচ্ছে। মাটির নিজস্ব যে জীবনীশক্তি, তাকে অক্ষুণ্ণ রেখেই এই বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি আজ এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।

কৃষির এই রূপান্তরে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির অবদানও ভোলার মতো নয়। পরীক্ষাগারের কাঁচনলে উদ্ভিদের একটিমাত্র কোষ বা কলার টুকরো থেকে শত শত রোগমুক্ত চারা উৎপাদন করে তাক লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশে আলু, কলা কিংবা বাহারি ফুলের বাণিজ্যিক উৎপাদনে এই প্রযুক্তির সুফল এখন গ্রামের সাধারণ কৃষকদের ঘরেও পৌঁছে গেছে। কৃষকরা যখন দেখেন যে একটিমাত্র চারা থেকে ল্যাবরেটরির কল্যাণে শত শত সবল চারা তৈরি হচ্ছে, তখন তাদের মুখের সেই চওড়া হাসিই এই বিজ্ঞানের সার্থকতা প্রমাণ করে। অন্যদিকে প্রাণীবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক জ্ঞান কাজে লাগিয়ে গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজনন এবং মাছের উন্নত জাতের পোনা উৎপাদন করা হচ্ছে। এর ফলে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন রাতারাতি বেড়ে গেছে, যা গ্রামীণ জনপদের পুষ্টিহীনতা দূর করার লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ অর্থনীতি আজ আগের তুলনায় অনেক বেশি গতিশীল এবং আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতেও শুরু করেছে, যা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে ভেতর থেকে মজবুত করছে।

বাস্তব জীবনের একটা ছোট্ট দৃশ্যপট চোখের সামনে আনলে এই নিবিড় সম্পর্কটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমাদের মফস্বল অঞ্চলের রহিম চাচার কথাই ধরা যাক। বয়স হয়েছে মানুষটার, হাড়ভাঙা খাটনি ছাড়া তিনি জীবনের অন্য কোনো হিসাব চেনেন না। গত বছর সকালে উঠে তিনি যখন তার বোরো ধানের খেতে গেলেন, তখন মাজরা পোকার আক্রমণে খেতের সব সোনালী স্বপ্ন বিবর্ণ হয়ে যেতে দেখলেন। আগের দিনে হলে তিনি মাথায় হাত দিয়ে খেতের আইলে বসে পড়তেন এবং বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়তেন। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের বদৌলতে এলাকার কৃষি কর্মকর্তা তাকে এমন এক প্রতিরোধী ধানের জাত আর জৈব সার ব্যবহারের পরামর্শ দিলেন, যা ওই পোকাদের ধারের কাছেও ঘেঁষতে দেয় না। রহিম চাচা যখন সেই বীজ বুকলেন, তখন অতিরিক্ত কীটনাশক কেনার বাড়তি খরচ থেকে যেমন তিনি বেঁচে গেলেন, তেমনি খেতের ফসলও হলো সম্পূর্ণ বিষমুক্ত। বিজ্ঞানের এই নীরবধী মিতালি আমাদের পাতে এক মুঠো নিরাপদ ভাত পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রতিদিন ল্যাব থেকে মাঠে লড়াই করে চলেছে। রহিম চাচার মতো এমন হাজারো কৃষকের জীবনে আজ এই বিজ্ঞান এনে দিয়েছে স্বস্তির পরশ।

মানব স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতিটি পরতে জীববিজ্ঞানের এই সম্পৃক্ততা আরও বিস্তৃত রূপ ধারণ করে। মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে কথা উঠলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্টেথোস্কোপ গলায় কোনো চিকিৎসকের মুখ কিংবা কোনো হাসপাতালের ব্যস্ত করিডোর। কিন্তু প্রমিত অর্থে স্বাস্থ্য বা চিকিৎসার জগতটা কেবল প্রেসক্রিপশন লেখার মারপ্যাঁচ নয়; এর মূল শেকড়টা গেঁথে আছে সোজা জীববিজ্ঞানের গভীরে। রোগবালাইয়ের উৎস কোথায়, একটা ভাইরাস কীভাবে মানুষের রক্তে এসে হানা দেয় কিংবা কোষের ভেতরে কোন গোলযোগের কারণে মারণব্যাধি ক্যানসার তার জাল বিস্তার করে—সেসবের নিখুঁত ময়নাতদন্ত করতে গেলে জীববিজ্ঞানের সাহায্য ছাড়া এক পাও চলা যায় না। ক্যানসারের চিকিৎসায় আজ যে ইমিউনোথেরাপি বা টার্গেটেড ড্রাগ থেরাপির কথা বলা হচ্ছে, তা হুট করে আকাশ থেকে টুকে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। কোষের স্বাভাবিক বিভাজন প্রক্রিয়ায় কোথায় তাল কাটছে, জিনগত কোন সংকেত বদলে গিয়ে কোষগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে উঠছে—এই জটিল হিসাব-নিকাশগুলো জীববিজ্ঞান ছাড়া অন্য কেউ এমন পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিতে পারত না।

তবে মুশকিল হলো, শুধু রোগ চিনে রাখলেই তো আর যুদ্ধ জেতা যায় না; দরকার হয় নিখুঁত সব হাতিয়ারের। আর এখানেই আধুনিক প্রযুক্তির সাথে জীববিজ্ঞানের এক অভাবনীয় মিলন ঘটেছে। আপনারা খেয়াল করলে দেখবেন, আজকাল চিকিৎসাবিজ্ঞানে যেসব অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি বা ডায়াগনস্টিক টুলস ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর মূল ভিত্তি কিন্তু জৈবিক বিজ্ঞান। এমআরআই স্ক্যানার থেকে শুরু করে জিন সিকোয়েন্সিং করার বিশাল সব মেশিন—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে জীববিজ্ঞানের নানা থিওরি আর প্রকৌশলবিদ্যার অদ্ভুত এক মেলবন্ধন। মানুষ যখন শরীরের ভেতরের কোনো জটিল রোগ নিখুঁতভাবে ধরতে যায়, তখন এই যন্ত্রগুলোই আমাদের চোখের সামনে শরীরের ভেতরকার অবয়ব এনে দেয়। যন্ত্র নিজে থেকে তো আর বোঝে না কোনটা সুস্থ কোষ আর কোনটা টিউমার; জীববিজ্ঞানের দেওয়া ডেটা আর সূত্র ধরেই যন্ত্রগুলো আজ জীবন বাঁচানোর কাজে এত বড় ভূমিকা রাখছে।

শুধু কি আর ল্যাব বা যন্ত্রপাতির ব্যবহার? স্বাস্থ্য সুরক্ষার আসল লড়াইটা তো শুরু হয় মানুষকে সচেতন করার জায়গা থেকে। জনস্বাস্থ্য বা পাবলিক হেলথের পুরো কাঠামোটা দাঁড়িয়ে আছে এই জীববিজ্ঞানের শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে। সমাজে যখন কোনো অজানা জ্বর বা মহামারী ছড়িয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষকে কীভাবে সতর্ক করতে হবে, কোন নিয়মগুলো মানলে রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব—তার একটা বৈজ্ঞানিক রূপরেখা তৈরি করে দেয় এই জীববিজ্ঞানই। একজন মানুষ না বুঝে হয়তো ভাবতেও পারে না যে তার প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস বা পারিপার্শ্বিক পরিবেশ কীভাবে তার শরীরের জিন বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সাথে লুকোচুরি খেলছে। এই জায়গাগুলোতে মানুষকে সচেতন করা, তাদের ভেতর সঠিক ধারণা পৌঁছে দেওয়া এবং একটা স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার অভ্যাস গড়ে তোলার কাজটা আদতে জীববিজ্ঞানেরই নীরব সাধনা।

আমাদের দেহের ভেতর প্রতিনিয়ত যে কোটি কোটি কোষ জন্ম নিচ্ছে এবং ধ্বংস হচ্ছে, তার সুশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করার কাজটিও পরিচালিত হয় জিনগত কোডের নিখুঁত ইশারায়। এই সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ার সামান্য ত্রুটিই ডেকে আনতে পারে মারাত্মক ক্যানসারের মতো ব্যাধি। আধুনিক জীববিজ্ঞানের অন্যতম বড় আশীর্বাদ হলো জিনোম এডিটিং প্রযুক্তি, যা দিয়ে ডিএনএর নির্দিষ্ট ত্রুটিপূর্ণ অংশকে কেটে বাদ দিয়ে সেখানে সুস্থ ও স্বাভাবিক কোড বসিয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। অণুজীব বিজ্ঞান এবং ইমিউনোথেরাপির এই অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জন্মগত অনেক রোগকে চিরতরে নির্মূল করার পথ দেখাচ্ছে। এই সূক্ষ্ম অণুর জগত নিয়ে কাজ করার সময় গবেষকেরা বুঝতে পারেন যে প্রকৃতির প্রতিটি নকশা কত নিখুঁত এবং সুশৃঙ্খল। সামান্য একটি ডিএনএর সুতোর ভেতরে পুরো মানুষের ভবিষ্যৎ ভাগ্য লুকিয়ে থাকার এই রহস্য বিজ্ঞানীদের আজও অবাক করে দেয়।

অন্যদিকে, স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্স আজ আমাদের ভাবনার জগতকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। মানুষের মস্তিষ্কের ভেতরে থাকা শত শত কোটি নিউরনের এই জটিল যোগাযোগ ব্যবস্থা এক রহস্যময় ব্রহ্মাণ্ডের মতো কাজ করে। আমরা কীভাবে চিন্তা করি, কীভাবে স্মৃতিগুলো মনের কোণে জমা হয়ে থাকে কিংবা আবেগ কীভাবে আমাদের শরীরকে প্রভাবিত করে—তার সবকিছুই এই বিজ্ঞানের সুবাদে আজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মস্তিষ্কের কোষগুলোর পারস্পরিক এই নিরন্তর বার্তা আদান-প্রদান আমাদের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখে। এই নিগূঢ় রহস্য ভেদ করার মাধ্যমেই গবেষকেরা আজ হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ফিরিয়ে আনার এবং অবশ হয়ে যাওয়া অঙ্গকে আবার সচল করার নতুন পথ খুঁজে পাচ্ছেন। মন আর শরীরের এই গভীর সংযোগ মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলোর একটি, যা জীববিজ্ঞানের হাত ধরেই উন্মোচিত হচ্ছে।

মাঠের এই সুজলা-সুফলা রূপ রক্ষা করার পাশাপাশি আমাদের চারপাশের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতেও জীববিজ্ঞান সমানতালে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমান পৃথিবীর সামনে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম হলো জলবায়ু পরিবর্তন এবং মাত্রাতিরিক্ত পরিবেশ দূষণ। গাছপালা কীভাবে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শুষে নিয়ে আমাদের বেঁচে থাকার মতো নির্মল বাতাস উপহার দেয়, তা আমরা বাস্তুতন্ত্রের পাঠ থেকে নিখুঁতভাবে জানতে পারি। মাটি ও পানির দূষণ রোধ করতে অণুজীবের সাহায্য নেওয়ার নানা অভিনব কৌশল নিয়ে বিজ্ঞানীরা দিনরাত গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। পচনশীল বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে মানসম্মত বায়োফার্টিলাইজার বা জৈব সার তৈরির মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এক নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটে চলেছে। এই উদ্যোগগুলো আমাদের একটি সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এক সুদূরপ্রসারী আশার আলো দেখাচ্ছে। প্রকৃতিকে ধ্বংস না করে প্রকৃতির নিয়মেই তাকে বাঁচিয়ে রাখার এই প্রয়াস মানবসভ্যতার টিকে থাকার মূল শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শহরের কংক্রিটের খাঁচায় বন্দি মানুষের জীবন থেকে যখন সবুজ প্রকৃতির ছোঁয়া হারিয়ে যেতে বসেছে, তখন এই দূরত্ব ঘোচাতে এগিয়ে এসেছে নগর জীববিজ্ঞান বা আর্বান ইকোলজি। ঘরের ভেতরে ও ছাদের ওপর নানা উদ্ভিদ লাগিয়ে বায়ুদূষণ কমানো এবং শহুরে উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে গাছপালার ভূমিকা নিয়ে এখন বিস্তর কাজ হচ্ছে। উদ্ভিদের মাধ্যমে ঘরের বাতাস পরিশুদ্ধ করার এই বৈজ্ঞানিক কৌশল বা ফাইটোরেমিডিয়েশনের ধারণাটি আজ শহরের প্রতিটি পরিবারে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কংক্রিটের এই ঘোর অরণ্যেও সবুজের এই আলতো ছোঁয়া মানুষের মানসিক অবসাদ দূর করে এক নতুন প্রাণশক্তি জোগায়। যান্ত্রিক জীবনের হাঁপিয়ে ওঠা বুকটাকে একটু স্বস্তি দিতে মানুষ আজ ব্যালকনিতে বা ছাদবাগানে সবুজের মেলা বসাচ্ছে, যার পেছনে রয়েছে জীববিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট কিছু প্রায়োগিক জ্ঞান।

উদ্ভিদের জগৎ এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জীববিজ্ঞানের ভূমিকা প্রতিনিয়ত এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। সমুদ্রের তলদেশে লুকিয়ে থাকা অজস্র রহস্যময় অণুজীব নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা এমন সব উপাদান আবিষ্কার করছেন, যা মারণব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই করতে জাদুকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। আবার ইথনোবটানি বা লোকজ উদ্ভিদবিজ্ঞান আদিবাসীদের হাজার বছরের প্রথাগত ভেষজ জ্ঞানকে আধুনিক ল্যাবরেটরির গবেষণার সাথে যুক্ত করেছে। শত শত বছর ধরে বনের মানুষেরা যেসব লতাগুল্ম ও গাছের শিকড় দিয়ে বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা করে আসছে, বিজ্ঞানীরা আজ সেগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে যাচাই করে মূল্যবান ওষুধ তৈরি করছেন। প্রকৃতির এই অপার ওষুধভাণ্ডার আমাদের চিকিৎসা ক্ষেত্রকে আরও অনেক বেশি সমৃদ্ধ করে তুলছে। আদিম মানুষের সেই লোকজ বিশ্বাসের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধন প্রমাণ করে যে সত্য অনেক সময় প্রথাগত জ্ঞানের মাঝেই লুকিয়ে থাকে।

ভবিষ্যতের পৃথিবীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে জীববিজ্ঞানের গুরুত্ব দিন দিন আরও বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের গবেষক ও শিক্ষার্থীরা যখন এই বিজ্ঞানের রহস্য উদ্ঘাটনে নিজেদের নিয়োজিত করেন, তখন তারা কেবল পুঁথিগত বিদ্যায় আবদ্ধ থাকেন না, বরং বাস্তবধর্মী উদ্ভাবনের মাধ্যমে সমাজকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। আমাদের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জীববিজ্ঞানের ব্যবহারিক প্রয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে আগামী দিনের তরুণ প্রজন্ম দেশের কৃষিখাত থেকে শুরু করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে আরও বড় কোনো বিপ্লব ঘটাতে পারে। পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ল্যাবরেটরির কাঁচনল আর মাঠের কাদামাটিতে কাজ করার মাধ্যমেই প্রকৃত বিজ্ঞানী তৈরি হয়। প্রকৃতির সাথে মানুষের এই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং জীববিজ্ঞানের নিরন্তর চর্চাই আমাদের আগামী দিনগুলোতে একটি সুন্দর, স্বাস্থ্যকর ও সমৃদ্ধ পৃথিবী উপহার দিতে পারে।

করোনার মহামারীর সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করলেই বোঝা যায়, মানবজাতিকে সুরক্ষিত রাখতে জীববিজ্ঞান কতটা আক্ষরিক অর্থেই ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। টিকা কীভাবে কাজ করে এবং এর উৎস কী তার প্রক্রিয়াটি জটিল আর প্রশংসনীয় । সাধারণত, কোনো ক্ষতিকর ভাইরাসের দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় রূপ কিংবা তার জিনগত প্রোটিনের একটি নির্দিষ্ট অংশ মানবদেহে প্রবেশ করানো হয়, যাতে আমাদের শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম আগে থেকেই সেই শত্রুকে চিনতে ও মোকাবিলা করতে প্রস্তুত হতে পারে। ল্যাবরেটরিতে কোষ কালচার বা জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে এই প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো তৈরি করা হয়, যা শরীরের কোষগুলোকে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি প্রস্তুত করতে প্রশিক্ষণ দেয়। কেবল বর্তমানের করোনা মহামারীতেই নয়, এর বহু আগেও ইনফ্লুয়েঞ্জা, পোলিও, বসন্ত কিংবা হামের মতো ভয়ংকর সব রোগ মানবজাতি থেকে নির্মূল করতে টিকাকরণই নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে আসছে।

শুধু মহামারী বা টিকাই নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে বিজ্ঞানের বিশাল পরিধি জুড়ে জীববিজ্ঞানের বহুমুখী ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। অপরাধ বিজ্ঞান বা ফরেনসিক সায়েন্সের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্তকরণ, জীবপ্রযুক্তির (বায়োটেকনোলজি) সাহায্যে জিনগত রোগ নিরাময়, কিংবা জিন পরিবর্তনের সহনশীল নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবন সবকিছুর মূলেই রয়েছে এই বিজ্ঞান। এমনকি শিল্পকারখানায় পরিবেশবান্ধব এনজাইমের ব্যবহার নিশ্চিত করা কিংবা মহাশূন্যে উদ্ভিদের অভিযোজন ক্ষমতা নিয়ে গবেষণা পরিচালনার ক্ষেত্রেও জীববিজ্ঞান আজ মানবজাতির সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছে।

পরিবেশের এই দীর্ঘমেয়াদী ভারসাম্য টিকিয়ে রাখতে এবং প্রকৃতির ক্ষতি না করে জীবনযাত্রাকে টেকসই করতে আজ বিশ্বজুড়ে বায়োপ্লাস্টিক এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে চলছে বিপ্লব। উদ্ভিদের শব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব এমন সব উপাদান তৈরি করা হচ্ছে যা মাটিতে খুব সহজেই পচে মিশে যায় আর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে না। এর ফলে প্লাস্টিক দূষণের মারাত্মক ছোবল থেকে আমাদের সুন্দর পৃথিবী ধীরে ধীরে মুক্তি পাচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কীভাবে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস খুঁজে পাওয়া যায়, তা নিয়ে তরুণ বিজ্ঞানীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন আবিষ্কার উপহার দিচ্ছেন। মানুষ এখন বুঝতে শিখেছে যে প্রকৃতির ক্ষতি করে সাময়িক কোনো উন্নয়ন টিকতে পারে না, তাই টেকসই উন্নয়নের বিকল্প হিসেবে জীববিজ্ঞানের এই বিকল্প শক্তিগুলো আজ আশার সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

ভবিষ্যতের অজানা পথে মানবজাতির টিকে থাকার এই কঠিন লড়াইয়ে জীববিজ্ঞান আরও অনেক বেশি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্বাস করা যায়। মহাকাশ গবেষণার অংশ হিসেবে ভিনগ্রহে বা মহাশূন্যে উদ্ভিদের বেঁচে থাকার উপায় নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন থেকেই নানা কৌতূহলোদ্দীপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহে প্রাণের সঞ্চার করতে হলে উদ্ভিদের অভিযোজন ক্ষমতা সম্পর্কে জানা সবার আগে জরুরি। ন্যানোটেকনোলজি এবং জীববিজ্ঞানের সুষম মিলনে তৈরি হচ্ছে এমন সব যুগান্তকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম, যা মানুষের জীবনযাত্রাকে দীর্ঘ ও রোগমুক্ত করতে পারে। এই অবিরাম ও নিরলস গবেষণা প্রমাণ করে যে বিজ্ঞানের এই শাখাটি কেবল বর্তমানের সংকটগুলোই সমাধান করছে না বরং একটি দীপ্তিময় ও সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের পথ তৈরি করে দিচ্ছে। মানুষের সীমাহীন কৌতূহল আর প্রকৃতির অপার রহস্যের এই মিতালি মানবসভ্যতাকে নিয়ে যাবে এক অনন্য সাফল্যে। সবুজের চিরসবুজ ক্যানভাসে মানুষের মেধা আর জীববিজ্ঞানের মেলবন্ধন এভাবেই রচিত হোক এক নতুন রূপকথা। মাটির সাথে মানুষের নাড়ির আর বিজ্ঞানের সঙ্গে নিপুণ ছোঁয়া যুগ যুগ ধরে আমাদের এই সপৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখুক গভীর আস্থায়।

লেখক: দৃষ্টি ঘোষ গল্প, দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, কিশোরগঞ্জ

Categories:

Leave a Reply

Keep Reading